ক্যানসার কি? ক্যানসার থেকে বাঁচার উপায় কি?
11 Jan 2026
ক্যানসার:
আধুনিক মেডিকেল বিজ্ঞানের আলোকে একটি বিস্তৃত পর্যালোচনা
ভূমিকা
ক্যানসার (Cancer) হলো একদল রোগের সমষ্টি, যেখানে শরীরের কোষগুলো নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিভাজিত হয়ে বৃদ্ধি পায় এবং স্বাভাবিক টিস্যু ও অঙ্গের কার্যকারিতা নষ্ট করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুযায়ী, ক্যানসার বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। মেডিকেল বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে ক্যানসারের কারণ, বিকাশপ্রক্রিয়া, নির্ণয় ও চিকিৎসা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ক্যানসারের সংজ্ঞা
মেডিকেল প্যাথলজির ভাষায়, ক্যানসার হলো একটি malignant neoplasm, যার বৈশিষ্ট্য—
-
অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত কোষবৃদ্ধি
-
আশেপাশের টিস্যুতে অনুপ্রবেশ (invasion)
-
শরীরের দূরবর্তী স্থানে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা (metastasis)
স্বাভাবিক কোষ বনাম ক্যানসার কোষ
স্বাভাবিক কোষের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
-
নির্দিষ্ট হারে বিভাজন
-
DNA ক্ষতিগ্রস্ত হলে নিজে থেকেই ধ্বংস (apoptosis)
-
আশেপাশের কোষের সাথে সমন্বয় বজায় রাখা
কিন্তু ক্যানসার কোষ—
-
নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিভাজিত হয়
-
apoptosis এড়িয়ে যায়
-
নিজস্ব রক্তনালী তৈরি করে (angiogenesis)
-
ইমিউন সিস্টেমকে ফাঁকি দিতে পারে
ক্যানসার হওয়ার মূল কারণ (Etiology)
১. জেনেটিক কারণ
ক্যানসার মূলত একটি genetic disease, যেখানে DNA mutation ঘটে। গুরুত্বপূর্ণ জিনগুলো হলো—
-
Oncogene (যেমন: RAS, MYC)
-
Tumor suppressor gene (যেমন: p53, RB)
-
DNA repair gene (যেমন: BRCA1, BRCA2)
২. পরিবেশগত ও লাইফস্টাইল ফ্যাক্টর
-
ধূমপান → ফুসফুস, মুখগহ্বর, গলার ক্যানসার
-
অ্যালকোহল → লিভার, খাদ্যনালীর ক্যানসার
-
অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার → কোলন, ব্রেস্ট ক্যানসার
-
রেডিয়েশন → থাইরয়েড, লিউকেমিয়া
৩. সংক্রমণজনিত কারণ
কিছু ভাইরাস ও জীবাণু ক্যানসারের সাথে সরাসরি যুক্ত—
-
HPV → সার্ভিক্যাল ক্যানসার
-
Hepatitis B ও C → লিভার ক্যানসার
-
EBV → Burkitt lymphoma
-
H. pylori → গ্যাস্ট্রিক ক্যানসার
ক্যানসারের বিকাশ প্রক্রিয়া (Carcinogenesis)
ক্যানসার ধাপে ধাপে তৈরি হয়—
-
Initiation – DNA mutation শুরু
-
Promotion – mutated কোষের বর্ধন
-
Progression – পূর্ণমাত্রার malignant আচরণ
এই পুরো প্রক্রিয়ায় বহু বছর সময় লাগতে পারে।
ক্যানসারের প্রকারভেদ
মেডিকেল বই অনুযায়ী ক্যানসারকে মূলত নিচের ভাগে ভাগ করা হয়—
১. কার্সিনোমা (Carcinoma)
-
epithelial tissue থেকে উৎপন্ন
-
সবচেয়ে বেশি দেখা যায়
-
উদাহরণ: ব্রেস্ট, লাং, কোলন ক্যানসার
২. সারকোমা (Sarcoma)
-
connective tissue থেকে
-
হাড়, মাংসপেশি
-
তুলনামূলকভাবে বিরল
৩. লিউকেমিয়া (Leukemia)
-
bone marrow ও রক্তের ক্যানসার
-
solid tumor তৈরি করে না
৪. লিম্ফোমা (Lymphoma)
-
লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের ক্যানসার
৫. CNS টিউমার
-
ব্রেইন ও স্পাইনাল কর্ডের টিউমার
-
benign হলেও জীবনসংহারী হতে পারে
মেটাস্টাসিস: ক্যানসারের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক
মেটাস্টাসিস হলো ক্যানসার কোষের—
-
রক্তনালী
-
লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম
ব্যবহার করে দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়া।
সাধারণ মেটাস্টাটিক সাইট—
-
লিভার
-
ফুসফুস
-
হাড়
-
ব্রেইন
ক্যানসারের লক্ষণ
লক্ষণ ক্যানসারের ধরন ও স্থানের উপর নির্ভর করে। সাধারণ সতর্ক সংকেত—
-
অকারণে ওজন কমে যাওয়া
-
দীর্ঘদিনের জ্বর
-
রক্তক্ষরণ
-
অস্বাভাবিক গাঁট
-
দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা

ক্যানসার নির্ণয় (Diagnosis)
১. ইমেজিং
-
X-ray
-
CT scan
-
MRI
-
PET scan
২. ল্যাবরেটরি পরীক্ষা
-
Tumor marker (AFP, PSA, CEA)
৩. বায়োপসি (Gold standard)
-
Histopathology
-
Immunohistochemistry
-
Molecular testing
ক্যানসারের স্টেজিং
সবচেয়ে ব্যবহৃত হলো TNM system—
-
T → Tumor size
-
N → Node involvement
-
M → Metastasis
স্টেজ নির্ধারণ চিকিৎসা ও prognosis এর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যানসারের চিকিৎসা (Treatment)
১. সার্জারি
-
প্রাথমিক ও স্থানীয় ক্যানসারে সবচেয়ে কার্যকর
২. কেমোথেরাপি
-
দ্রুত বিভাজনশীল কোষ ধ্বংস করে
৩. রেডিওথেরাপি
-
DNA ক্ষতিগ্রস্ত করে ক্যানসার কোষ মারে
৪. টার্গেটেড থেরাপি
-
নির্দিষ্ট molecular target এর উপর কাজ করে
৫. ইমিউনোথেরাপি
-
শরীরের নিজস্ব ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় করে
ক্যানসার প্রতিরোধ (Prevention)
মেডিকেল গাইডলাইন অনুযায়ী—
-
ধূমপান পরিহার
-
ভ্যাকসিন (HPV, HBV)
-
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
-
নিয়মিত স্ক্রিনিং
উপসংহার
ক্যানসার একটি জটিল, বহুস্তরবিশিষ্ট রোগ, যার পেছনে জেনেটিক, পরিবেশগত ও জীবনযাপনজনিত কারণ জড়িত। আধুনিক মেডিকেল বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে আজ ক্যানসার আর শুধুমাত্র একটি মৃত্যুদণ্ড নয়; বরং সঠিক সময়ে নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসায় বহু ক্যানসার নিয়ন্ত্রণযোগ্য ও নিরাময়যোগ্য। সচেতনতা, প্রতিরোধ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসাই ক্যানসারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
ডা:আমিনুর রহমান।। ব্রেইন, স্পাইন ও ট্রমা বিশেষজ্ঞ নিউরোসার্জন।। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।